আন্তর্জাতিক

অপচয় কমাতে ফিলিপাইন্সে অভিনব উদ্যোগ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : আধুনিক জীবনযাত্রার অঙ্গ হিসেবে অনেক খাবার নষ্ট হয়৷ ফলে অপচয়ের পাশাপাশি জলবায়ুরও মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে৷ ফিলিপাইন্সে এক প্রকল্পের আওতায় খাদ্যের অপচয় কমানোর চেষ্টা চলছে৷ খবর ডয়চে ভেলের।

আবর্জনারস্তূপে খাবারের সন্ধান :
আবর্জনার স্তূপে উচ্ছিষ্ট খাবার দেখলে খাওয়ার ইচ্ছা জাগার কথা নয়৷ কিন্তু ক্ষুধার চোটে বাধ্য হয়ে এ সব খেতে হয়৷ ম্যানিলা শহরে ভোর থেকেই আবর্জনা কুড়ানিরা ফেলে দেওয়া খাদ্যের সন্ধান চালিয়ে যান৷ ফিলিপা বাল্ডে নিজের পরিবারকে এই ‘পাগপাগ’ বা আবর্জনার স্তূপে কুড়িয়ে পাওয়া খাদ্যের অবশিষ্ট অংশ খাওয়ান৷ ফিলিপাইন্সের ১ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষের দিনে তিনবেলা খাবার সামর্থ্য নেই৷

ফিলিপাইন্সে খাদ্যের অপচয়ও কম হয় না৷ পকেটে টাকা থাকলে রেস্তোরাঁয় ‘যত পারো তত খাও’ বুফে ভোজে অফুরন্ত খাবার খাওয়া যায়৷ শেষ পর্যন্ত প্লেট যে খালি হয় না, তাতে বিস্ময়ের কারণ আছে কি? ডাব্লিউডাব্লিউএফ-এর মেলোডি মেলো-রাইক মনে করিয়ে দেন, ‘‘যখন আপনি খাবার নষ্ট করছেন, তখন আসলে অনেক সম্পদ নষ্ট হচ্ছে৷ যেমন পানি, বিদ্যুৎ, মাটির পুষ্টি৷ খাবার উৎপাদন, পাঠানো, বিতরণের মতো অন্তর্বর্তীকালীন প্রক্রিয়ার মধ্যেও অপচয় ঘটে৷ এই সব বিষয় গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন তরান্বিত করছে৷”

অপচয় কমানোর উপায় :
মেলোডি মেলো-রাইক এমন এক প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যার আওতায় রেস্তোরাঁ ও হোটেলগুলিকে খাদ্য অপচয় কমানোর বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে৷ ম্যানিলা থেকে গাড়িতে ঘণ্টাদেড়েক দূরে পর্যটকদের প্রিয় তাগাইতাই শহর৷ মেলোডি সেখানকার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছেন৷

সপ্তাহান্তে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণির অসংখ্য মানুষ শহরের ব্যস্ততা থেকে পালিয়ে সেখানে চলে যান৷ বলাবাহুল্য খাওয়াদাওয়াও মনোরঞ্জনের মধ্যে পড়ে৷ সেখানকার পিকনিক পার্ক একটা বড় আকর্ষণ৷ ফিলিপাইন্সের মানুষ সাধারণত দিনে পাঁচ বার খাওয়াদাওয়া করেন৷ এখানে সবাই বাসা থেকে কিছু না কিছু নিয়ে আসেন৷

দেশে সমৃদ্ধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অপচয়ের মাত্রাও বাড়ছে৷ সারা বছর গোটা দেশে প্রায় তিন লক্ষ টন চাল ফেলে দেওয়া হয়৷ মার্লন আসুয়েলোর মতো কিছু মানুষ এই প্রবণতার বিরুদ্ধে কিছু একটা করতে চান৷ স্পা হোটেলের রাঁধুনী হিসেবে তিনি শুধু অতিথিদের জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশন করতে চান না৷ জঞ্জালের পরিমাণ কমাতেও তিনি উদ্যোগ নিচ্ছেন৷

জঞ্জালের পুনর্ব্যবহার :
পারলে সব কিছুই কাজে লাগাতে চান তিনি৷ অবশিষ্ট অরগ্যানিক জঞ্জাল কাজে লাগিয়ে তিনি সার তৈরি করেন৷ মার্লন তাঁর অতিথিদের আচরণের উপরেও প্রভাব রাখছেন৷ মার্লন আসুয়েলো বলেন, ‘‘আসলে সবচেয়ে ভালো উপায় হলো প্লেটে খাবারের পরিমাণ স্থির করা৷ কারণ আগে আমরা প্রচুর পরিমাণ খাবার পরিবেশন করতাম৷ ফলে তার অনেকটাই নষ্ট হতো৷ তাই আমরা পরিমাণ কমানোর সিদ্ধান্ত নিলাম৷ কিন্তু আমাদের খাদ্য তালিকায় কিছু পদ এখনো দু’জন অথবা পাঁচজনের পরিবারের জন্য যথেষ্ট হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে৷ কিন্তু একক ব্যক্তিদের জন্য আমরা পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছি৷ এমনভাবে প্লেট সাজাচ্ছি, যাতে মনে হয় তাতে অনেক খাবার রয়েছে৷”

মার্লন আসুয়েলো মেলোডি-র প্রকল্পে অংশ নিচ্ছেন৷ তাঁকে সাধারণত রাঁধুনীদের বুঝিয়ে বলতে হয়, যে খাদ্যের অপচয় কীভাবে জলবায়ুর ক্ষতি করছে৷ মেলোডি বলেন, ‘‘খাদ্যের অপচয় ঘটলে সেগুলি আবর্জনার স্তূপে গিয়ে জমা হয়৷ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় ক্ষয়ের সময় সেগুলি মিথেনের মতো আরও মারাত্মক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করে, যা কার্বন ডাই অক্সাইডের তুলনায় ২০ গুণেরও বেশি শক্তিশালী৷ ফলে আমাদের বায়ুমণ্ডলে উষ্ণতা বন্দি হয়ে পড়ে৷”

রাঁধুনী হিসেবে মার্লন জানেন যে দামি হোটেলে কোর্সের আয়োজন করলে শুধু হাতে গোনা কিছু মানুষ এ বিষয়ে সচেতন হবেন৷ অদূর ভবিষ্যতে আর শুধু স্বেচ্ছায় অপচয় কমালে চলবে না৷ নতুন এক আইন কার্যকর হলে ফিলিপাইন্সে রেস্তোরাঁ ও সুপারমার্কেটগুলিকে উদ্বৃত্ত খাবার দান করতে হবে৷

ম্যানিলার দরিদ্র এলাকার চালচিত্র :
ততদিন পর্যন্ত বস্তা বস্তা বর্জ্য খাবার আবর্জনার স্তূপে জমা হতে থাকবে, যেমনটা ম্যানিলার পায়াতাস নামের এলাকায় দেখা যায়৷ ধনীদের আবর্জনা দরিদ্রদের জীবনধারণের ভিত্তি হয়ে উঠেছে৷

ফিলিপা বাল্ডে তাঁর ‘পাগপাগ’ নিয়ে বাসায় ফিরছেন৷ দুই বছর আগে স্বামীর মৃত্যুর পর ৬৭ বছর বয়সি এই নারীর কাঁধে সংসার চালানোর দায়িত্ব এসে পড়েছে৷ তখন থেকেই তিনি আবর্জনা কুড়ানি হিসেবে কাজ করছেন৷ বাসায় ফিরে তিনি কুড়িয়ে পাওয়া মুরগির মাংস ব্যাকটেরিয়া-মুক্ত করতে পানিতে ফোটাচ্ছেন৷ পিঁয়াজ ও মসলা যোগ করে তিনি সন্তান ও নাতিনাতনিদের জন্য রাতের খাবার রান্না করলেন৷ তিনি এই কঠিন পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, ‘‘এখানে হয় কাজ আছে কিংবা নেই৷ অবশ্যই এমন খাবার খেতে না হলেই ভালো হতো৷ কিন্তু এ ছাড়া উপায় নেই৷ জীবন বড় কঠিন৷”

ধনীদের উচ্ছিষ্ট খেয়ে বেঁচে থাকলেও ভবিষ্যতে অপচয়ের বদলে উদ্বৃত্ত খাবার দান করা হলে ফিলিপা বাল্ডে-র জীবনযাত্রা অনেক সহজ হয়ে উঠবে৷ কারণ তাঁর মতে, আবর্জনার দুর্গন্ধে কখনোই অভ্যস্ত হওয়া যায় না৷



জুমবাংলানিউজ/এসআর

সর্বশেষ সংবাদ




আপনি আরও যা পড়তে পারেন


সর্বশেষ সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ