অপরাধ-দুর্নীতি জাতীয় বিভাগীয় সংবাদ স্লাইডার

উদভ্রান্ত বাবার লুঙ্গী ধরে টানাটানি করে প্রিয় ছেলের লাশের সন্ধান দিল বিড়াল!

বিড়ালজুমবাংলা ডেস্ক: ‘গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর থানার গোয়াবাহারা গ্রামের নার্গিস শিকদারের স্বামী আবুল হাসান ওরফে জনি শেখ গত ০২ দিন ধরে উদভ্রান্ত হয়ে গোয়াবাহারা গ্রামের আনাচে-কানাচে ঘুরছেন। ক্লান্ত হয়ে যখন শ্বশুর বাড়িতে ফেরেন তখন বাড়ির পোষা বিড়ালটি তার লুঙ্গী ধরে টানাটানি করে। তিনি বিরক্ত প্রকাশ করলে বিড়ালটি শৌচাগারের সেফটি ট্যাংকের উপরে নিরবে বসে থাকে। জনি ও তার স্ত্রী’র একটাই চিন্তা- তাদের একমাত্র শিশু সন্তান নাহিদ শেখ কোথায় গেল ?

স্বচ্ছলতার আশায় গেন্ডারিয়ার ঢালকা নগরের জনি শেখ সুদে টাকা নিয়ে কিস্তিতে ২টি ব্যাটারী চালিত পুরানো অটো কেনেন। আশা ছিল তিনি ও তার শ্যালক মনির শিকদার অটো দুইটি চালিয়ে বছর খানেকের মধ্যে ঋন ও কিস্তি পরিশোধ করতে পারবেন। ভাগ্য খারাপ- ব্যাটারী দুইটি চার্জ নিতো বেশী কিন্তু চলতো কম। তিনি লোকসানে পড়ে যান। প্রায় দুই লক্ষ টাকার একক দেনা মাথায় নিয়ে সম্পূর্ণ বাধ্য হয়ে তিনি অটো দুইটি অর্ধেক দামে বিক্রি করে দেন। এ দিশাহীন পরিস্থিতিতে এগিয়ে আসেন তার গৃহবধু স্ত্রী। তিনি স্বামীর পাশে থাকতে চান। জনি শেখ ঢাকার গ্লোরী এক্সপ্রেসের ড্রাইভার এবং নার্গিস সিকদার গৃহকর্মীর কাজ খুজেঁ নেন। প্রচন্ড বাস্তববাদী এ দম্পতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ – কঠোর পরিশ্রম করে সকল দায় শোধ করে একদিন ঘুরে দাড়াবেনই। সে অনুযায়ী ২০১৬ সালের জানুয়ারী মাসের শুরুতেই তারা তাদের প্রায় চার বছর বয়সী শিশুটিকে মুকসুদপুরে নানা-নানীর কাছে রেখে আসেন। খবর পান তাদের ছেলেটি ভালো আছে এবং নাহিদের ৩ বছর বয়সী একমাত্র মামাত ভাই মিনহাজ শিকদার এর সাথে খেলা-ধুলা করে সময় কাটাচ্ছে।

সদা হাসি-খুশি স্বভাবের নাহিদ শেখ অত্যন্ত সুশ্রী। বুদ্ধিমান এ শিশুটি, প্রতিবেশীদের ভাষায়-খুব সুন্দর পাকা পাকা কথা বলে। প্রতিবেশীরা সুযোগ পেলেই নাহিদকে আদর করে ভাল কিছু খাওয়ানোর চেষ্টা করে। সবচেয়ে বেশী আদর করতো নানা-নানী। নানা-আদম আলী শিকদার বাশেঁর ঝুড়ি বানিয়ে নিকটবর্তী হাটবাজারে বিক্রয় করেন। উর্পাজনের একটি বড় অংশ ব্যয় করেন তার দুই নাতি ও পোতা নাহিদ শেখ ও মিনহাজ শিকদারের আবদার মেটাতে।

সেদিনও ছিল হাটবার। আদম আলী সিকদার দুপুরের খাবার খেয়েই তাড়াহুড়ো করে ঝুড়ি নিয়ে হাটে গেলেন। যাবার সময় দেখে গেলেন পুত্রবধু ফাতেমা বেগম তার দুই নাতি-পোতাকে খাবার দেয়ার জন্য তোরজোর শুরু করেছে। দুপুর গড়িয়ে বিকাল। তিনি হাটে বসেই খবর পেলেন নাহিদ শেখকে খুজেঁ পাওয়া যাচ্ছে না। পুত্রসহ যত দ্রুত পারেন চলে আসেন। প্রতিবেশীরাসহ সবাই মিলে সম্ভাব্য সকল জায়গায় খুজঁলেন। সন্ধ্যায় মাইক দিয়ে গ্রামের সবাইকে অনুরোধ করলেন নাহিদকে খোজাঁর জন্য। জনি শিকদার স্ত্রীসহ ঢাকা থেকে গোপালগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।

২৫ শে ফেব্রুয়ারী,২০১৬। ০৩ দিন হলো নাহিদকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবারটিতে হতাশা ও শংকা ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলছে। জনি শেখ আর কোথায় কোথায় নাহিদকে খুঁজবেন ঠিক করতে পারছেন না। হঠাৎ খেয়াল করলেন- বিড়ালটি তার পাশে কিছুক্ষণ ঘোড়াঘুড়ি করে আবার লুঙ্গী ধরে টানাটানি শুরু করেছে। তিনি কি জানি মনে করে বিড়ালটির সাথে সোজা চলে গেলেন, সেই পারিবারিক সেফটি ট্যাংকের উপর- আস্তে আস্তে অন্যমনস্কভাবে ট্যাংকের উপরের স্লাবটি সরালেন।

চার বছরের শিশু নাহিদ শেখ খুন হয়েছে। খুনের প্রমাণ লোপাটের জন্য শিশুটির মৃতদেহ সেফটি ট্যাংকে ফেলে দেয়া হয়েছে। পুলিশ ও আদম আলী পরিবারের সন্দেহ এ খুনের সাথে জড়িত একই গ্রামের আদম আলীর সৎ শ্যালক আব্দুল হক সরদার-গং। এদের সাথেই জমি-জমা নিয়ে সম্পত্তির বিরোধ। পুলিশ একে একে গ্রেফতার করে সরদার ও তার সহযোগিদের। কিন্তু খুনের রহস্যের আর কিনারা হয় না। প্রায় চার মাস পর মামলাটি নিয়ে আসা হয় পিবিআই’তে।

পিবিআই ইনচার্জ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিলু মিয়া বিশ্বাস, সাব-ইন্সপেক্টর আব্দুল মজিদসহ একটি দল নিয়ে দফায় দফায় যায় গোয়াবাহারা গ্রামে। তদন্ত দল খোজাঁর চেষ্টা করে কে কে নাহিদকে সর্বশেষ কখন দেখেছিল। তালিকায় থাকে আদম আলী সিকদারের বাড়ির পার্শ্ববর্তী ৪/৫টি দোকানের মালিক, খরিদ্দার, দোকানের সামনে সময় কাটাতে বসা গ্রামবাসী এবং আদম আলীর প্রতিবেশীসহ সকলেই। সময় ও তালিকা সংক্ষিপ্ত হতে হতে এক সময় নিয়ে আসা হয় জনি শেখের শ্যালক মনির শিকদারের স্ত্রী, নাহিদ শেখের মামী ফাতেমা বেগমকে।

ফাতেমা বেগমের একটাই কথা-দুপুরে খাবার সময়ে নাহিদকে ডাকতে গিয়ে আর খুজেঁ পাওয়া যায় নি। তার পক্ষে সাক্ষী দেন আদম আলীর প্রতিবেশী ফাতেমা বেগমের খালা শাশুড়ি মর্জিনা বেগম ও খালা শ্বশুর আব্দুল হক। ফাতেমা বেগম ভাঙ্গবে তবু মচকাবে না। তদন্ত দল এবার অন্য কৌশল ধরে। নাহিদকে যখন ভরদুপুরে খাবার দেবার জন্য ডেকে পাওয়া যায় নি তখন ফাতেমা বেগম কি কি করেছে, কাকে কাকে বলেছে এবং কোথায় কোথায় খুজেঁছে; তার বক্তব্য তাৎক্ষনিকভাবে যাচাই করা হয়। ফাতেমা বেগম নিজের বোনা জালে নিজেই আটকে যান। তিনি আদালতের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেবার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন।

আদালত তখনই দোষ স্বীকার রেকর্ড করেন যখন অপরাধীর বক্তব্য হয় স্বেচ্ছাপ্রনোদিত। এ দোষ স্বীকারের প্রমাণ-মূল্য অকাট্য (Substantive Evidence) – যদি এটির সমর্থন (Corroboration) মেলে সরাসরি (Direct Evidence) বা পারিপার্শ্বিকতায় (Circumstantial Evidence)। এক্ষেত্রে পুলিশ ধরে নেয়- সর্বোচ্চ শাস্তি অনিবার্য।

ফাতেমা বেগম আদালতে বলেন-শ্বশুর ও শাশুড়ি খাওয়ার পর তিনি ধীরে সুস্থে খাওয়াতে বসেন নাহিদ ও মিনহাজকে। সেদিন ডিম ছিল একটি। তিনি ডিমটি দুই ভাগ করে দুইজন’কে দেন। মিনহাজের ভাগে যায় বড় অংশটি। নাহিদ প্রশ্ন তুলে- সে মিনহাজের পাতের বড় অংশটি চায় এবং দুই জনে মারা-মারি শুরু করে। তিনি মারা-মারি থামানোর জন্য দুই জনকেই থাপ্পর মারেন, কিন্তু নাহিদ টাল সামলাতে না পেরে পাশে থাকা চৌকির পায়ার নিচে ইটের উপর পড়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। নাহিদের চোখে ও মুখে জল ছিটানোর পরও জ্ঞান না ফেরায় নিশ্চিত হন নাহিদ মারা গেছে। একদম লাগোয়া ঘরটি ফাতেমার খালা শাশুড়ি মর্জিনা বেগম ও তার স্বামী আব্দুল হকদের। ফাতেমা তাদের মৃত্যুর বিষয়টি জানিয়ে বাচাঁনোর পরামর্শ চায়। অবশেষে মর্জিনা ও আব্দুল হকের সহায়তায় ফাতেমা বেগম সেফটি ট্যাংকের স্লাব সরিয়ে নাহিদের ছোট্ট দেহটি ছেড়ে দেয় ময়লায় পরিপূর্ণ এক অন্ধকার কূপে; চিরতরে নিভিয়ে দেয় এক সংগ্রামী দম্পতির চোখের আলো। মর্জিনা বেগমও আদালতে প্রমাণ লোপাটের কথা স্বীকার করেছেন।

ডাঃ তপন মজুমদার নাহিদের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে লিখেছেন-“Death was due to asphyxia resulting from strangulation which was ante mortem and homicidal in nature.”। ফাতেমা বেগম সত্য লুকিয়েছেন। চোখ ও মুখে জল ছিটানোর পর নাহিদের জ্ঞান ফেরে। সে আতংকে চিৎকার করে ওঠে। এ চিৎকার থামানোর জন্য ফাতেমা বেগম সজোরে শিশুটির নাক ও মুখ চেপে ধরে। এক সময় খেয়াল করে নাহিদ চিরদিনের জন্য স্তদ্ধ হয়ে গেছে।

অপাপবিদ্ধ শিশু নাহিদ শেখ’কে তার উজ্জল ভবিষ্যতের আশায় যখন তার বাবা-মা পরম নির্ভরতায় নানা-নানির কাছে রেখে যায় তখন কল্পনাতেও এসেছিল যে, এ ঘরেই লুকিয়ে আছে তাদের পরম আদরের ধনের ঘাতক! কেউ না বুঝুক বিড়ালটি বুঝেছিল। বিজ্ঞান বলে-পশুপাখিরা বিপদ আগেই আঁচ করতে পারে। খুব জানতে ইচ্ছে করে, ওরা কি মানুষের মনের কপটতাও টের পায়?

সুত্র – মুকসুদপুর থানার মামলা নং- ২১, তাং – ২৫/০২/২০১৬ খ্রিঃ ধারা-৩০২/২০১/৩৪ দঃ বিঃ।

লেখক: বনজ কুমার মজুমদার, ডিআইজি, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন



জুমবাংলানিউজ/এইচএম




আপনি আরও যা পড়তে পারেন


Add Comment

Click here to post a comment

সর্বশেষ সংবাদ