বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

মাত্র ৫ সেকেন্ড অক্সিজেন শূন্য হলে কি ঘটবে পৃথিবীতে?

20বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক : বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেনের কোনো বিকল্প নেই, এই কথাটি কমবেশি আমরা সকলেই জানি। আমাদের অনেকেরই ধারণা কেবল প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্যেই হয়তো অক্সিজেন দরকার। না, আদতে সেটি নয়। শুধু প্রাণ নয় বরং এই পৃথিবীর সবকিছুর সাথেই জড়িয়ে আছে অক্সিজেন। এমনকি আমরা যেই মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছি, সেই মাটিকেও ধরে রাখে প্রায় ৪৫ শতাংশ অক্সিজেন। এই অক্সিজেন মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখতে সাহায্য করে। এর অভাবে মাটি হালকা হয়ে ধসতে শুরু করবে। আর মাটি ধসে গেলে আমাদের কারো পক্ষেই টিকে থাকা সম্ভব হবে না।

আচ্ছা এবার মনে করুন একদিন হুট করে পৃথিবী অক্সিজেনহীন হয়ে গেল। তাও বেশি সময়ের জন্য নয়, মাত্র পাঁচ সেকেন্ডের জন্য। তখন কী হবে? আপনার মনে হতে পারে পাঁচ সেকেন্ডে কী-ই-বা আর হবে। কারণ বেশির ভাগ মানুষই কমপক্ষে ৩০ সেকেন্ড শ্বাস-প্রশ্বাস না নিয়ে থাকতে পারে। অথচ আশ্চর্য হলেও সত্য, পাঁচ সেকেন্ডের অক্সিজেনহীন অবস্থার কারণেই ভেঙে পড়বে কংক্রিটের স্থাপনা, উল্কার মতোই খসে পড়বে আকাশে উড়তে থাকা প্লেন, ঘটে যাবে পরিবেশের বিশাল বিপর্যয়। চারিদিক পরিণত হবে ধ্বংসস্তূপে।

আমরা জানি, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ২১ ভাগই অক্সিজেন। আর ৭৮ ভাগ নাইট্রোজেন। যদিও দেখা যাচ্ছে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের চেয়ে বেশি অংশজুড়ে রয়েছে নাইট্রোজেন। তবুও এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অনেকটা একটা ভবনের ফাউন্ডেশনের মতো। অক্সিজেন ছাড়া প্রাণী, উদ্ভিদ, পানি এমনকি মানুষও নিজস্ব অবস্থানে ঠিকমত থাকবে না।

পানি তৈরি হয় দু ভাগ হাইড্রোজেন এবং একভাগ অক্সিজেন মিলে। এখন যদি হঠাৎ করে পানির মধ্যে থাকা অক্সিজেন নাই হয়ে যায় তবে পড়ে থাকবে শুধুই হাইড্রোজেন। হাইড্রোজেন এককভাবে কেবল গ্যাস এবং যা সবচেয়ে হালকা। হাইড্রোজেন যদি অক্সিজেন থেকে আলাদা হয় তবে মুহূর্তের মধ্যে তা আকাশের দিকে যেতে থাকবে। এমনকি পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশে চলে যাবে। ফলে পৃথিবীতে যত পানি আছে সব বাষ্পীভূত হতে থাকবে।

আমরা ইট বালি এবং সিমেন্টকে একত্র করে দালান তৈরি করি। কিন্তু এই ইট, বালি, কংক্রিট—এদের জমিয়ে রাখে কে বলতে পারেন? এদের জমিয়ে রাখার কাজটা করে অক্সিজেন। এমনকি একটা কংক্রিট ভাঙলে যে ছোট কণা হয়ে যায়, সেইসব কণাকেও একত্র করে রাখে অক্সিজেন। যেই সময় বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন নাই হয়ে যাবে সাথে সাথেই এইসব কংক্রিটের দালান পাউডারের মতো গুঁড়া হয়ে যেতে শুরু করবে।

গাছের সাথে অক্সিজেনের একটা সম্পর্ক আছে বলেই আমরা জানি। গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয় এবং আমাদের থেকে কার্বন টেনে নেয়। কিন্তু আপনি জানেন কি, যদি শুধু অক্সিজেন না থাকে তবে এই পৃথিবীতে যত গাছ আছে সব শুকিয়ে যাবে। কেননা গাছকেও বাঁচিয়ে রাখে অক্সিজেন। আর নিমিষের অক্সিজেনহীনতা হতে পারে সেই গাছের জন্য ধ্বংসের কারণ। সবচেয়ে বেশি পরিমাণ অক্সিজেন উৎপন্ন করে গাছ ফটোসিন্থেসিস এর মাধ্যমে। তাই গাছকে রক্ষা করা এবং গাছ লাগানো কতটা জরুরি তা তো বুঝতেই পারছেন। অক্সিজেন না থাকলে যত ধাতু আছে সব একসঙ্গে জুড়ে যাবে। কেননা প্রতিটি ধাতুর ওপর অক্সিজেনের স্তর থাকে এবং সেটি না থাকলে পরস্পরের সাথে লেগে থাকা ধাতু নিজে থেকেই জুড়ে যাবে।

শুধু যে ঘরবাড়ি আর গাছপালা তা নয়। অক্সিজেন ছাড়া আগুনও থাকবে না। পৃথিবীর সব জায়গায় যেখানে আগুন জ্বলছে সব নিভে যাবে। কারণ আমরা সবাই জানি অক্সিজেন কোনো কিছুকে জ্বলতে সাহায্য করে। অক্সিজেনের অভাবে ভেঙে পড়বে আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা। পৃথিবীতে যত গাড়ি আছে সব বন্ধ হয়ে যাবে। একটি গাড়ির ইঞ্জিন কাজ করে ফিউলের সাহায্যে। কিন্তু যদি অক্সিজেন না থাকে তবে কম্প্রেসন হবে না এবং সঙ্গে সঙ্গেই বন্ধ হয়ে যাবে সব গাড়ি। আকাশে আমরা যে বিমান দেখতে পাই সাঁই সাঁই করে মেঘের ভেতর দিয়ে উড়ে যায়, সেই বিমান বা হেলিকপ্টার তাদের ওড়া বন্ধ করে দেবে অক্সিজেনের অভাবে। হাজার হাজার মাইল উপর থেকে ছিটকে পড়বে মাটিতে।

আমাদের মাথার উপরে যে সূর্য আছে তার অতি বেগুনি রশ্মি পৃথিবীতে প্রবেশে বাধা দেয় ওজন স্তর। এ স্তরটি অক্সিজেনের তৈরি। তাই যদি অক্সিজেন না থাকে, তাহলে এই অতি বেগুনি রশ্মি থেকে আমাদের রক্ষা পাবার কোনো উপায় থাকবে না। রোদে পুড়ে যাবে সবকিছু। মুহূর্তের ভেতর গলে যাবে বড় বড় বরফের চাকা। আর পৃথিবী হয়ে উঠবে বসবাসের অনুপোযোগী।

অক্সিজেন কণা আলোকে রিফ্লেক্ট করে। আর সেজন্য অক্সিজেন না থাকলে পৃথিবীতে ঘনিয়ে আসবে অন্ধকার। আলোর রিফ্লেকশনের অভাবেই এই অবস্থা তৈরি হবে। দিনের বেলাতেও তখন দেখা যাবে ঘুটঘুটে কালো অন্ধকার।

এ তো গেল কেবল যান্ত্রিক জীবনের কথা। মাত্র পাঁচ সেকেন্ডের অক্সিজেনহীনতা আমাদের জীবনে আরো কী প্রভাব ফেলতে পারে শুনুন।

মস্তিষ্কের সব ধরনের কাজের একমাত্র জ্বালানি অক্সিজেন। বলা হয়, মস্তিষ্কে অক্সিজেনের চালান কমে আসলে হেল্যুসিনেশন দেখা দিতে পারে। এসময় উল্টা-পাল্টা দৃশ্য দেখতে শুরু করে মানুষ। আপনার দেহে মস্তিষ্কই সবচেয়ে বেশি অক্সিজেন গ্রহণ করে। যদিও দেহের ওজনের মাত্র দুই শতাংশ দখল করে মগজ। এই ছোট যন্ত্রই কিন্তু দেহের উৎপাদিত শক্তির ২০ শতাংশ খেয়ে ফেলে। অক্সিজেনের অভাব চলতে থাকলে মাথায় মস্তিষ্কের কোষগুলো মরতে শুরু করে।

শুধু কি মস্তিষ্ক? অক্সিজেনের অভাবে ফেটে যাবে আমাদের শ্রবণ স্তর। অক্সিজেন হারানো মানে হলো আমাদের বাতাসের চাপ ২১ শতাংশ হারানো। এটা যদি ধীরে ধীরে হতো তাহলে হয়তো তা মানিয়ে নেওয়া যেত। কিন্তু এত দ্রুত বাতাসের চাপে পরিবর্তন অনেকটা হঠাৎ করে সমুদ্রের দুই হাজার মিটার নিচে পতিত হওয়ার মতোই। আমাদের কান এত দ্রুত পরিবর্তন সহ্য করতে পারবে না। যে কোনোভাবে উৎপন্ন শব্দ শুনতে হলে যে শুধুমাত্র আমাদের কানই যথেষ্ট তা একেবারেই নয়। এর পেছনেও অক্সিজেনের ভূমিকা রয়েছে। কানের মধ্যে যে ইয়ার ড্রাম রয়েছে তা কাজ করে অক্সিজেনের সাহায্যে। অর্থাৎ কোনো শব্দ শোনার জন্য প্রয়োজন অক্সিজেন। কিন্তু হঠাৎ উধাও হয়ে গেলে বাতাসের চাপ কমে কানের ইয়ার ড্রাম ফেটে যাবে এবং এটি ঘটবে মাত্র এক সেকেন্ডের মধ্যেই। এরপরে অক্সিজেন এসে গেলেও শোনার ক্ষমতা আমাদের থাকবে না। ফলে মানুষ হারাবে তার শ্রবণ ক্ষমতা।

আমাদের শরীরের ৭০% পানি। আগেই বলেছি পানি তৈরি হয় অক্সিজেন এবং হাইড্রোজেনের মিশ্রণে। এরপর হঠাৎ অক্সিজেন উধাও হয়ে গেলে আমাদের শরীর শুকিয়ে যাবে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের শরীর হয়ে যাবে মমির মতো। আর এটা শুধু মাত্র মানুষের সাথে ঘটবে এমন নয়, বরং পৃথিবীতে যত প্রাণী আছে সবার ক্ষেত্রেই এমনটাই ঘটবে।

আপনি হয়তো ভাবছেন পাঁচ সেকেন্ড পর যখন অক্সিজেন ফিরে আসবে তখন হয়তো সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কিন্তু বিষয়টি মোটেও এমন নয়। পাঁচ সেকেন্ড পর যদি হঠাৎ অক্সিজেন ফিরেও আসে তাহলে পুরো পৃথিবী ঠান্ডা হয়ে যাবে। সাথে সাথে ঘটবে ভয়ানক বিস্ফোরণ। কারণ অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসা মাত্র সবকিছু অক্সিডাইসড হতে শুরু করবে। ঘটতে থাকবে ভয়ঙ্কর সব ঘটনা। মাত্র পাঁচ সেকেন্ডের অক্সিজেনহীনতা হতে পারে এই পৃথিবীর ধ্বংসের কারণ।



জুমবাংলানিউজ/এসআই

সর্বশেষ সংবাদ




আপনি আরও যা পড়তে পারেন


Add Comment

Click here to post a comment

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ