অপরাধ-দুর্নীতি

মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তারাই জড়িত মাদক কারবারে!


জুমবাংলা ডেস্ক : কিশোরগঞ্জের ভৈরবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সার্কেল অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও আটক বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। ফলে সার্কেল ইন্সপেক্টর মাসুদুর রহমানসহ দু’জন সিপাহীকে শোকজ করা করা হয়েছে। তাদেরকে আগামী ৩ কার্যদিবসের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া সেন্টু রঞ্জন নাথ নামে একজন সাব ইন্সপেক্টরকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে।

মুঠোফোনে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন কিশোরগঞ্জ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. হাবীব তৌহিদ ইমাম।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১৩টি উপজেলার মধ্যে ৬টি উপজেলা নিয়ে ভৈরব মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সার্কেল অফিস। এই সার্কেল অফিস থেকে ভৈরবসহ কুলিয়ারচর, বাজিতপুর, নিকলী, অষ্টগ্রাম ও কটিয়াদী উপজেলায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। তাছাড়া সড়ক, রেল ও নৌ-পথে অবাদ যাতায়াতের কারণে মাদকের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ভৈরবকে ব্যবহার করছে চোরাকারবারিরা। ফলে ভৈরবে দেশের দ্বিতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সার্কেল অফিস স্থাপন করা হয়। একই সাথে দেশের বন্দরনগরী ভৈরবে মাদকের প্রবেশ বন্ধে এবং মাদক ব্যবসায়ী বা চোরাকারবারিদের আটক করে আইনের হাতে সোপর্দ করতে এই সার্কেল অফিসে একজন ইন্সপেক্টর, একজন সাব ইন্সপেক্টর এবং মহিলাসহ ৩ জন সিপাহী নিয়োগ দেওয়া হয়। শহরের আমলাপড়ায় এই সার্কেল অফিস তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভৈরবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সার্কেল অফিস থাকলেও শহরের কমলপুর, পঞ্চবটি, চন্ডিবের, কালিপুরসহ উপজেলার শ্রীনগর, আগানগর, সাদেকপুর, গজারিয়া, শিবপুর, শিমুলকান্দি ও কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের পাড়া-মহল্লায় মাদকের ছড়াছড়ি। ফলে হাত বাড়ালেই মেলে মরণ নেশা ইয়াবা নামক ট্যবলেট। শুধু তাই নয়, শহরের পাওয়ার হাউজের হরিজন কোলনী এবং চান্দানী টিলায় প্রতিদিন শত শত লিটার চোলাই মদ তৈরি হলেও নজর নেই সার্কেল অফিসের। এমনকি শহরের আমলা পাড়ায় খোদ সার্কেল অফিসের চারপাশে মাদকের ছড়াছড়ি থাকলে যেন দেখার কেউ নেই। ফলে নির্বিগ্নে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করছে মাদক ব্যবসায়ীরা। আর মাদকের টাকা যোগার করতে শহরে বাড়ছে চুরি, ছিনতাইয়ের ঘটনা। ফলে প্রায়ই ঘটছে হতাহতের ঘটনাও।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক মাস চাকরির সুবাদেই মাদক কারবারিদের সাথে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সার্কেল অফিসের লোকজনের সখ্যতা গড়ে ওঠে। ফলে প্রতি মাসে হাতিয়ে নেয় তারা মাসোহারা। মাঝে মধ্যে লোক দেখানো অভিযান পরিচালনা করলেও দেখা যায় চিহ্নিত ইয়াবা ব্যবসায়ীদের না ধরে গাঁজাসেবীদের আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে হাতে গোনা দু’একজনকে সাজা দেওয়া হয়েছে।

আবার কখনো কখনো চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের কেউ আটক হলেও তাকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, গেল ৩ মাস আগে শিবপুর ইউনিয়নের শম্ভুপুর গ্রামের কালা মিয়া বাড়িতে অভিযান চালায় সার্কেল অফিসের লোকজন। এ সময় কালা মিয়াকে না পেয়ে ঘরের ভেতরে তল্লাশী করে আলমিরাতে রাখা তার মেয়ের বেতনের দশ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে সাব ইন্সপেক্টর সেন্টু রঞ্জন নাথ ও তার সহকর্মী সিপাহীদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার পরদিন কালা মিয়ার মেয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণায়সহ সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর বরাবরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

যদিও এ ঘটনার সাথে জড়িতদের শাস্তি হয়েছে কিনা এ বিষয়ে জানেন না কেউ। এ ছাড়া রেল স্টেশন এলাকা থেকে হাতকড়া পড়িয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রায় এক বছর আগে ভৈরব সার্কেল অফিসে কর্মরত ইন্সপেক্টর কামনাশীষ সরকারের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে। ফলে তিনি মাদকসহ থানা পুলিশের হাতে আটক হন। পরে তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে ভৈরব মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সার্কেল অফিসের ইন্সপেক্টর মাসুদুর রহমানের সাথে দেখা করতে গত দু’সপ্তাহে ৩ বার গিয়েও তার দেখা মেলেনি। এমনকি অফিসের বাইরে তালা ঝুলতে দেখা যায়। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে সাইনবোর্ড না থাকার কারণে দূর থেকে এটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ভৈরব সার্কেল অফিস কিনা বোঝার উপায় নেই।

এ ব্যপারে কিশোরগঞ্জ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. হাবীব তৌহিদ ইমাম মুঠোফোনে এ প্রতিবেদককে জানান, ইতিমধ্যে ভৈরব সার্কেল ইন্সপেক্টর মাসুদুর রহমানসহ দু’জন সিপাহীকে শোকজ করা করা হয়েছে। তাদেরকে আগামী ৩ কার্যদিবসের মধ্যে জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সাব ইন্সপেক্টর সেন্টু রঞ্জন নাথকে অন্যত্র বদলি করেছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।

তিনি ভৈরব সার্কেল অফিসের নানা অনিয়মের কথা অকপটে স্বীকার করে বলেন, তাদের জন্য আমাকে চাপে থাকতে হয়। আগেও এই অফিসের ইন্সপেক্টর কামনাশীষ সরকারের অপকর্মের কারণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বদনাম হয়েছে। তাই তার বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ভৈরব সার্কেলের পরিদর্শক মাসুদুর রহমান ও সেন্টু রঞ্জন নাথকে অন্যত্র বদলির কথা স্বীকার করলেও তিনি ও তার অফিসের সিপাহীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাননি বলে জানান। এ ছাড়া অফিসের সাইনবোর্ড না থাকার বিষয়ে তিনি বাজেট নেই বলে জানান। সূত্র : কালের কন্ঠ


জুমবাংলানিউজ/এসআই