আন্তর্জাতিক

নাইজেরিয়ায় মাদ্রাসার ছদ্মবেশে নির্যাতন কেন্দ্র : পুলিশের অভিযানে বেরিয়ে আসছে ভয়ঙ্কর তথ্য

Dark Mode
এরকম স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশেই শিক্ষার্থীরা বসবাস করতো। ছবি -বিবিসি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় দাউরা শহরের একটি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের ওপর যেভাবে নির্যাতন চালানো হতো তার বিবরণ পড়লে যে কারোই গা শিউরে উঠবে।

কেউ চাইবে না এরকম একটি প্রতিষ্ঠানে কোন শিশু এক বছর তো দূরের কথা, এক মিনিটের জন্যেও সেখানে লেখাপড়া করুক। এধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে তল্লাশি চালাচ্ছে নাইজেরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী।

বেসরকারি এসব ধর্মীয় স্কুল ও পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে উদ্ধার করা হচ্ছে শিশুদের যারা সেখানে ভয়াবহ রকমের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের অনেকেরই শরীরেই রয়ে গেছে সেসব নির্যাতনের চিহ্ন। খবর- বিবিসি বাংলার।

যেসব শিশুদের নিয়ে পিতামাতারা বাড়িতে সমস্যায় পড়েছিল, কিম্বা যেসব তরুণ ছেলে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছিল, অথবা জড়িয়ে পড়েছিল ছোটখাটো অপরাধের সাথে, তাদের পরিবার তাদেরকে এসব প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতো, কিন্তু তারা ধারণাও করতে পারতো না তাদের প্রিয় সন্তানেরা সেখানে কী ধরনের দুর্বিষহ জীবন কাটাতো।

image

তল্লাশি চালানোর পর কর্মকর্তারা এসব প্রতিষ্ঠানকে ‘মাদ্রাসা’ নয় বরং উল্লেখ করছেন ‘নির্যাতন কেন্দ্র’ হিসেবে।

নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদু বুহারির নিজের শহর দাউরায় এরকম যে বাড়িটির সন্ধান পাওয়া যায় তাতে দুটো প্রধান ভবন। তার একটি ছিল রাস্তার একপাশে যেটি মোটামুটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, সেখানে শিশুদের কোরান পড়ানো হতো। আর রাস্তার আরেক পাশে শিক্ষার্থীদের থাকার জায়গা।

সেটি ভগ্নপ্রায় একতলা একটি বাড়ি। তাতে আছে পাঁচ থেকে ছ’টি অন্ধকারাচ্ছন্ন স্যাঁতস্যাঁতে ঘর, সেখানে বদ্ধ পরিবেশ, দরজা জানালায় লোহার গ্রিল লাগানো।

এসব ঘরে যেসব শিক্ষার্থীরা থাকতেন বিবিসিকে তারা বলেছেন, ঘরগুলো আসলে জেলখানার ছোট ছোট কক্ষের মতো। একেকটা কক্ষে রাখা হতো ৪০ জনের মতো শিক্ষার্থী এবং তাদের পায়ে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো।

তারা বলেছেন, শেকল পরা অবস্থাতেই প্রস্রাব-পায়খানা করার জন্যে তাদেরকে টয়লেটে যেতে হতো।

এই জায়গাতে তারা খাওয়াদাওয়া করতো ও ঘুমাতো।

সাবেক শিক্ষার্থীদের অনেকে বলেছেন, মারধর ও ধর্ষণ করার জন্যে এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা প্রায়শই তাদেরকে ঘরের বাইরে নিয়ে যেতেন।

ওই কেন্দ্রে আটক ছিলেন এরকম একজন রাবিউ উমর বিবিসিকে বলেছেন, “ওটা ছিল এই দোজখের মতো।”

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই মাদ্রাসা থেকে মোট ৬৭ জন বন্দী শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অল্পবয়সী কিশোর যেমন রয়েছে – তেমনি রয়েছে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষও।

পুলিশ জানিয়েছে, মাদ্রাসার নিবন্ধন খাতায় তারা মোট ৩০০ জন শিক্ষার্থীর নাম পেয়েছেন। তারা ধারণা করছেন, এর আগের সপ্তাহে মাদ্রাসার ভেতরে দাঙ্গা লেগে গেলে সেসময় অনেকেই ওখান থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

কর্মকর্তারা বলছেন, গত এক মাসে প্রায় ৬০০ জন শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করা হয়েছে যারা এরকম আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিবেশে বসবাস করতো।

শিক্ষার্থীরা বলেছেন, তাদের হাতে পায়ে শুধু যে শেকল পরিয়ে রাখা হতো কিম্বা চালানো হতো অমানবিক নির্যাতন তাই নয়, দিনের পর দিন তাদেরকে না খাইয়ে রাখা হতো।

নির্যাতিত এক দল শিক্ষার্থীকে প্রথম উদ্ধার করা হয় সেপ্টেম্বর মাসে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় কাদুনা শহরের রিগাসা এলাকায়।

একজন ছাত্রের এক আত্মীয় পুলিশকে খবর দিলে সেখানে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৫০০ জনকে উদ্ধার কার হয়। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন শিশুও ছিলো।

পরে এরা সাংবাদিক ও কর্মকর্তাদের কাছে যে পরিবেশে বসবাসের বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে অনেকেই স্তম্ভিত হয়েছেন।

তাদেরকে উদ্ধার করার সময় যেসব ভিডিও করা হয়েছে তাতে দেখা যায় শিক্ষার্থীরা হতবিহবল, তাদের পায়ে শেকল পরানো এবং অনেকের শরীরে ফোস্কা পড়ে গেছে।

মুক্তি পাওয়ার পর পরই তাদের কিছু ছবি বের হয়ে আসে । সেগুলোতে দেখা যায় তাদেরকে ছাদ থেকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, কারো হাত ও পা শেকল দিয়ে গাড়ির চাকার সাথে বাঁধা।

এই উদ্ধার অভিযানের পর কাদুনা রাজ্যের মানবাধিকার ও সামাজিক উন্নয়ন বিষয়ক কমিশনার হাফসাত বাবা বিবিসিকে বলেছেন, এধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে খুঁজে খুঁজে বের করে কর্তৃপক্ষ সেগুলো বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

তিনি আরো জানিয়েছেন, এসব কেন্দ্রের যারা মালিক তাদেরকেও “লোকজনকে বন্দী রেখে তাদের ওপর নির্যাতন চালানোর অভিযোগে” বিচার করা হবে।

দশ দিন আগে কাদুনারই এরকম আরেকটি কেন্দ্র থেকে প্রথমবারের মতো নারী শিক্ষার্থীকেও উদ্ধার করা হয়।

মিস বাবা বলেছেন, এটা অস্বাভাবিক ঘটনা – কারণ এধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাধারণত নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয় না।

এধরনের মাদ্রাসা বা ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নাইজেরিয়াতে গোপন কিছু নয়, সবাই এগুলো সম্পর্কে জানে, তারপরেও একের পর এক এধরনের ঘটনা বের হওয়ার পর সাধারণ লোকজনের মধ্যে এবিষয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

ডেইলি নাইজেরিয়ান নামের একটি অনলাইন মিডিয়ার জাফার জাফার বলেছেন, ওই এলাকায় যারা বসবাস করেন তাদের সবাই এসব বিষয়ে সবসময়েই জানতো।

“আমার বিশ্বাস হয় না নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় শহর ও গ্রামে যারা বড় হয়েছে তারা বলবে যে এসব স্কুল সম্পর্কে তাদের কোন ধারণা নেই। আমরা সবাই জানি এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের নির্যাতন করা হয়,” বলেন তিনি।

এই সাংবাদিক আরো জানিয়েছেন যে তিনি ১৯৮০ ও ১৯৯০ এর দশকে কানো শহরে বেড়ে উঠেছেন এবং সেসময়েও এধরনের অনেক স্কুল ছিল।

“লোকজন বিশ্বাস করে এধরনের স্কুলের আধ্যাত্মিক শক্তি আছে, সেখানে শিশুরা কতোটা অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে, কিম্বা তাদের সাথে কী ধরনের আচরণ করা হচ্ছে সেটা নিয়ে কেউ কিছু মনে করে না। তাদের সন্তানরা সেখানে কোরানের শিক্ষা পাচ্ছে কীনা সেটাই তাদের মূল ভাবনা।”

তবে অনেক পিতামাতাই দাবি করেছেন তাদের সন্তান যে এরকম পরিবেশে ছিল সেবিষয়ে তাদের বিন্দুমাত্র ধারণা ছিলো না।

কাদুনায় গত সেপ্টেম্বরের তল্লাশির পর একজন শিক্ষার্থীর পিতা ইব্রাহিম আদামু বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, “আমরা যদি জানতাম যে স্কুলে এরকম পরিবেশে তারা লেখাপড়া করছে, তাহলে তো আর ছেলেকে ওখানে পাঠাতাম না।”

“আমরা তো তাদেরকে ওখানে পাঠিয়েছে মানুষ হওয়ার জন্যে, এরকম নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতিত হতে নয়।”

স্থানীয় একজন পুলিশ কমিশনার সানুসি বুবা বলেছেন, শিক্ষার্থীরা যখন ওসব স্কুলে থাকতো, বাবা মায়েরা তখন তাদের সাথে কথাও বলতে পারতো না। এমনকি যখন তারা তাদের বাচ্চাদের সাথে দেখা করতে সেখানে যেতো তখন তাদেরকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হতো না, আর হলেও স্কুলের কর্মকর্তা কর্মচারীরা তাদেরকে নিয়ে যেতো।

তিনি বলেন, কোন পরিবারের একটি ছেলে যখন কিছুটা উচ্ছন্নে চলে যায়, তখন তাকে এরকম ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দেওয়া নাইজেরিয়াতে খুবই স্বাভাবিক বিষয়। পরিবার মনে করে, এসব প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দিলে তাদের ছেলে ঠিক হয়ে যাবে।

“কিন্তু এর উল্টোটাও হতে পারে” – তিনি বলছেন, “এসব প্রতিষ্ঠানে নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর অনেক সময় তাদের আচার-আচরণ আরো খারাপও হয়ে যেতে পারে।”

শিশুদেরকে এসব প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর পেছনে মাদকাসক্তি একটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করে।

জাতিসংঘের হিসেবে ২০১৭ সালে উত্তর-পশ্চিম নাইজেরিয়াতে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ৩০ লাখের মতো। তাদের মধ্যে পাঁচ লাখ ছিলো কাতসিনা রাজ্যে, সেখানে ছিলো এরকম দুটো পুনর্বাসন কেন্দ্র- একটি পুরুষ আর অন্যটি নারী শিক্ষার্থীদের জন্যে।

এধরনের সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাব থাকার কারণে পরিবারগুলো তাদের মাদকাসক্ত সন্তানদের জন্যে এসব বেসরকারি মাদ্রাসাকেই বেছে নেয়।

সরকারি যেসব পুনর্বাসন কেন্দ্র আছে সেগুলোর অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। গত বছর কানোতে এরকম কয়েকটি কেন্দ্রের ওপর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করেছিল বিবিসি। তাতেও দেখা গেছে, সেখানে মানসিক রোগীদের শেকল দিয়ে মাটির সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে।

বিবিসির সংবাদদাতা বলছেন, নাইজেরিয়ান পরিবারগুলোর হাতে কোন বিকল্প না থাকায় এসব নির্যাতনের খবরাখবর প্রকাশ হওয়া সত্ত্বেও তারা তাদের সন্তানদেরকে ‘মানুষ’ হওয়ার আশায় মাদ্রাসার মতো ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠিয়েই চলেছে।



জুমবাংলানিউজ/এসএস

সর্বশেষ সংবাদ




আপনি আরও যা পড়তে পারেন


জনপ্রিয় খবর

Add Comment

Click here to post a comment

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

জনপ্রিয় খবর