অপরাধ-দুর্নীতি জাতীয় ঢাকা

রূপকথার ‘খলনায়ক’ কে এই আজিজ মোহাম্মদ ভাই?

Dark Mode

আজিজজুমবাংলা ডেস্ক: ‘আজিজ মোহাম্মদ ভাই একজন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী। তিনি হত্যা ও মাদক পাচারসহ বেশ কয়েকটি গুরুতর অপরাধে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।’ তার পরিচয় সম্পর্কে এতটুকু বলা আছে উইকিপিডিয়ায়।

কিন্তু কে এই আজিজ মোহাম্মদ ভাই?

উইকিপিডিয়ার এই অল্পক’টি শব্দ তার পুরো পরিচয় নয়। কয়েক দশক ধরে তার যত্রতত্র কর্মকাণ্ড তাকে পরিচিতি দিয়েছে রূপকথার ‘খলনায়ক’। নামের শেষে ‘ভাই’ যুক্ত থাকায় অনেকে ধরেই নেন, তিনি এক অঘোষিত ‘গডফাদার’। যদিও এই ‘ভাই’ পদবিটি তার বংশ থেকে পাওয়া। আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের বাবা ও মায়ের নামের শেষেও রয়েছে ‘ভাই’। তার পিতার নাম মোহাম্মদ ভাই, মায়ের নাম খাদিজা মোহাম্মদ ভাই। তার পরিবারের সব নারী সদস্যের নামের শেষাংশে ওই ‘ভাই’ রয়েছে।

চলমান ক্যাসিনোবিরোধী ও শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে গতকাল রোববার বিকেলে গুলশানে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের বাসায় অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। শত শত বোতল বিদেশি মদ ও ক্যাসিনো সরঞ্জাম পাওয়া গেছে সেখানে। এর পরই আবার নতুন করে আলোচনায় এলেন আজিজ মোহাম্মদ ভাই।

জাতীয় দৈনিক সমকালের আজকের সংখ্যায় প্রকাশিত সাংবাদিক শাহাদাত হোসেন পরশের করা একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৪৭-এ দেশভাগের পর আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের পরিবার ভারতের গুজরাট থেকে বাংলাদেশে আসে। তাদের পরিবার মূলত পারস্য বংশোদ্ভূত। সেখানকার ‘বাহাইয়ান’ সম্প্রদায়ের সদস্য তারা। ‘বাহাইয়ান’কে সংক্ষেপে বলা হয় ‘বাহাই’। উপমহাদেশের উচ্চারণে এই ‘বাহাই’ পরবর্তী সময়ে ‘ভাই’ হয়েছে। বাংলাদেশে আসার পর ধনাঢ্য এই পরিবার বসবাস শুরু করে পুরান ঢাকায়। সেখানকার আরমানিটোলায় আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের জন্ম ১৯৬২ সালে। ব্যবসার  সঙ্গে যুক্ত ছিল তাদের পরিবার। পারিবারিক সূত্রে তিনি নিজেও ব্যবসা শুরু করেন একসময়। অলিম্পিক ব্যাটারি, অলিম্পিক বলপেন, অলিম্পিক ব্রেড ও বিস্কুট, এমবি ফার্মাসিউটিক্যাল, এমবি ফিল্মসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের মালিক তিনি। এ ছাড়া মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, হংকং, সিঙ্গাপুরে রয়েছে তার হোটেল ও রিসোর্ট ব্যবসা। আবার মাদক ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। আলোচিত ইয়াবা ডন আমিন হুদা তার ভাগ্নে।

উইকিপিডিয়ায় আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের ব্যাপারে তথ্য রয়েছে আরও একটি। তা হলো- সার্ক চেম্বার অব কমার্সের আজীবন সদস্য তিনি। অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানির পরিচালক। ব্যবসার পাশাপাশি নব্বই দশকে চলচ্চিত্র প্রযোজনায় নামেন এমবি ফিল্মসের ব্যানারে। চলচ্চিত্র জগতে তার পা দেওয়া নিয়ে আছে অনেক মত। কারও ভাষ্য, নায়িকাদের রূপের মোহ তাকে রঙিন দুনিয়ায় আকৃষ্ট করেছে। কেউ-বা আবার বলেন, কালো টাকা সাদা করতেই ওই পথে হাঁটেন তিনি। দু-চারজন এও বলেন, চলচ্চিত্রের প্রতি ভালোবাসা থেকেই সিনেমার জগতে নেমেছিলেন আজিজ মোহাম্মদ ভাই।

তার প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে পরিচালক, অভিনেতা, অভিনেত্রী, মিডিয়া মালিক ও সাংবাদিকরা সমীহ করে চলতেন তাকে। ৫০টির মতো চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেছেন আজিজ মোহাম্মদ ভাই। দেশের বিজ্ঞাপন জগতে নতুনত্ব আনতে তার জুড়ি ছিল না। নিজের প্রতিষ্ঠান অলিম্পিক ব্যাটারির ‘আলো আলো বেশি আলো’ বিজ্ঞাপনে মিতা নূরকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, তা তখন নজর কাড়ে সবার। আবার নিজের বিয়ে নিয়েও আজিজ মোহাম্মদ ভাই কম জল ঘোলা করেননি। পছন্দের কন্যাকে তুলে নিয়ে এক প্রকার জোর করেই বিয়ে করেন তিনি।

আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ড কানেকশন নিয়ে আছে নানা ধরনের গল্প। কথিত আছে, মুম্বাইয়ের ডন দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে রয়েছে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। জাতীয় পার্টির শাসনামলে তিনি একবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। এই গ্রেপ্তার নিয়েও আছে গুঞ্জন। কথিত আছে, নারীঘটিত বিরোধের জের ধরেই এরশাদের সবুজ সংকেত নিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। একজন পত্রিকা সম্পাদকের ‘মৃত্যুর’ পেছনে তার হাত রয়েছে, এমন কথাও প্রচলিত আছে।

তবে আজিজ মোহাম্মদ ভাই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসেন ১৯৯৭ সালে। জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহর রহস্যজনক মৃত্যুর পর অভিযোগ ওঠে, ওই ঘটনায় তার হাত ছিল। সালমানভক্তরা এখনও বিশ্বাস করেন, হত্যা করা হয়েছে সালমানকে। আর এর নেপথ্যে রয়েছেন আজিজ মোহাম্মদ ভাই। এই মৃত্যুরহস্য উদ্‌ঘাটনের ঘটনায় বিভিন্ন সময় দু’দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তাকে। তবে মৃত্যুরহস্য কাটেনি এখনও। সালমান শাহর পর ঢাকার এক অভিজাত ক্লাবে খুন হন চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী। অভিযোগ আছে, এ হত্যাকাণ্ডেও আজিজ মোহাম্মদ ভাই ও তার পরিবার জড়িত।

২০১২ সালে মাদক ব্যবসার অপরাধে আজিজের ভাগ্নে ইয়াবাসম্রাট বলে খ্যাত আমিন হুদার কারাদণ্ড হয় ৭৯ বছর। বর্তমানে আজিজ মোহাম্মদ ভাই থাইল্যান্ডে থাকেন সপরিবারে। সেখান থেকেই ব্যবসা পরিচালনা করেন। তার স্ত্রী নওরিন মোহাম্মদ ভাই স্বামীর এসব ব্যবসা দেখভাল করেন। তাদের তিন ছেলে ও দুই মেয়ে।

চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত একজন পরিচালক জানান, আনন্দফুর্তিতে জীবনকে উপভোগ করতে পছন্দ করেন আজিজ মোহাম্মদ ভাই। পার্টি, ক্লাব তার জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ। চালচলন ও কাজে তার একটি নিজস্ব স্টাইল রয়েছে। সেটা অনেকে পছন্দ করেন, কেউ করেন না।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, নানা অপরাধের সঙ্গে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সংশ্নিষ্টতার কথা শোনা যায়। তবে অকাট্য প্রমাণের অভাবে তাকে কখনই আইনের জালে বন্দি করা যায়নি। সবকিছুতে তিনি আছেন, আবার কোনো কিছুতেই প্রমাণ করা যায় না- এটাই তাকে জনমনে রহস্য পুরুষ হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে। বাংলাদেশের রহস্যময় ব্যক্তিদের তালিকা করলে তার নামটি ওপরের দিকেই থাকবে।

আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের জীবনাচরণ নিয়েও নানা কথা প্রচলিত আছে। কেউ বলেন, জীবনে তিনি যা একবার ব্যবহার করেছেন, তা দ্বিতীয়বার হাতে নেননি। কাকরাইলের সিনেমাপাড়া থেকে যে চুরুট ধরাতেন, তা টানতে টানতে বিমানবন্দর পর্যন্ত যেতেন।

১৯৯৬ সালে প্রতারণার মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ ও আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করে বিএসইসি। শেয়ার কেলেঙ্কারির ওই মামলায় গত বছরের ২৯ আগস্ট তাকে গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারি করেছিলেন পুঁজিবাজার বিষয়ক ট্রাইব্যুনাল। তার আগে থেকেই বিদেশে অবস্থান করছেন তিনি।



জুমবাংলানিউজ/এইচএম

সর্বশেষ সংবাদ




আপনি আরও যা পড়তে পারেন


জনপ্রিয় খবর

Add Comment

Click here to post a comment

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

জনপ্রিয় খবর