জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

লাইন রেন্ট তুলে দিয়ে গ্রাহক ফেরাতে পারবে সরকারি বিটিসিএলের ল্যান্ডফোন?

জুমবাংলা ডেস্ক: ধানমন্ডির বাসিন্দা আবুল মনসুর আহমেদ তাঁর বাসায় শখ করে একটি একটি ল্যান্ডলাইন সংযোগ নিয়েছিলেন। খবর বিবিসি বাংলার।

”ছোটবেলায় পাশের বাসায় টেলিফোন ছিল, আত্মীয়স্বজন সেখানে ফোন করতো। সেটা ধরতে গেলে তারা বাঁকা ভাবে তাকাতেন, আমাদেরও খুব বিব্রত লাগতো। কিন্তু তখন টেলিফোনের সংযোগ নেয়া খুব খরচের ব্যাপার ছিল, তাই নেয়া হয়নি। তখন থেকেই ইচ্ছা ছিল বাসায় একদিন টেলিফোনের সংযোগ নেবো।”

২০১৩ সালের দিকে ঢাকায় ফ্ল্যাট কেনার পরে তিনি ল্যান্ডফোনে সংযোগ নেন, যদিও পরিবারের সব সদস্যের নিজস্ব মোবাইল রয়েছে। খরচও হয় সামান্য। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের কাছে সেই ফোনের এখন আর চাহিদা নেই।

ইনস্যুরেন্সের কর্মকর্তা মি. আহমেদ বলছেন, ”আমার মোবাইল বিল অফিস থেকে দিয়ে থাকে, ফলে আমার আর ওই ফোনটা ব্যবহার করা হয় না। বাচ্চারা, আমার স্ত্রীরও মোবাইল আছে। আত্মীয়স্বজনও সবসময় মোবাইলে ফোন করেন। ফলে ওই ফোনটা আর ব্যবহারই করা হয়না, কিন্তু প্রতিমাসেই লাইন রেন্ট জমা হচ্ছে। ”

এখন তিনি ফোনটা সারেন্ডার করে দেয়ার কথা ভাবছেন।

মিরপুরের বাসিন্দা শাহনাজ পারভিন বলছেন, ”বাসায় ল্যান্ডলাইনের একটা ফোন আছে অনেকদিন ধরে। কেউ সেটা ব্যবহার করে না, কারণ মোবাইল থেকেই সহজে ফোন করা যায়। ল্যান্ডলাইনে ফোন করতে মোবাইল থেকে নাম্বার বের করে ডায়াল করা অনেক ঝামেলা। ফলে দিনে দিনে সেটা ওপর ধুলা জমেছে। একদিন আমি পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখি, সেটটা নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু প্রতিমাসেই লাইন রেন্ট দিতে হচ্ছে।”

কয়েকমাস আগে তিনি সংযোগটা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছেন।

কমছে গ্রাহক সংখ্যা
পাবলিক সুইচড টেলিফোন নেটওয়ার্ক (পিএসটিএন), যা ল্যান্ডফোন বলে গ্রাহকদের মধ্যে বেশি পরিচিত, বাংলাদেশে প্রতিবছর গ্রাহক হারাচ্ছে।

বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির অক্টোবর ২০১৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে পিএসটিএন বা ল্যান্ডফোন গ্রাহক রয়েছে প্রায় নয় লাখের মতো। অথচ একই সময়ে মোবাইল ফোনের গ্রাহক ছিল প্রায় সোয়া তের কোটি।

এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিটিসিএলের গ্রাহক রয়েছে সাড়ে সাত লাখ। তবে গত চার বছরে সেটি আরো দুই লাখ কমে এখন দাঁড়িয়েছে সাড়ে পাঁচ লাখে। অর্থাৎ প্রতিবছর প্রায় ৫০ হাজার গ্রাহক হারাচ্ছে সংস্থাটি।

এর বাইরে র‍্যাংকস টেলিকম ও বাংলা ফোনের অল্পকিছু গ্রাহক রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দাপ্তরিক চাহিদা ছাড়া আবাসিক খাতে এখন আর ল্যান্ডফোনের কোন চাহিদা নেই, ফলে এটির সংখ্যাও বাড়ছে না।

ফলে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে মাসিক লাইন রেন্ট তুলে দিয়ে মাসে ১৫০ টাকায় ইচ্ছামতো কথা বলার সুযোগ চালু করতে যাচ্ছে কোম্পানিটি। প্রতিমাসে ভ্যাটসহ প্রায় ১৭৫ টাকা গ্রাহকদের দিতে হবে, বিনিময়ে তারা ইচ্ছামতো যেকোনো বিটিসিএল নম্বরে কথা বলতে পারবেন।

১৬ অগাস্ট থেকে এই সুবিধাটি চালু হবে। তবে মোবাইলে কথা বলতে হলে মিনিটে ৫২ পয়সা দিতে হবে।

বিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইকবাল মাহমুদ বিবিসি বাংলাকে বলছেন, যে গ্রাহকরা চলে গেছেন, আমরা তাদের আবার ফিরিয়ে আনতে চাইছি। বিশেষ করে বাসায় যারা থাকেন, তারা যেন আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ল্যান্ড ফোন ব্যবহারে আগ্রহী হন, আমরা সেই চেষ্টা করছি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোবাইল থেকে ল্যান্ডফোনে গ্রাহক ফেরানো হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

কিন্তু ল্যান্ডফোনে গ্রাহক ফেরানো কতটা সম্ভব?
ভয়েস কল সুবিধা দিয়ে গ্রাহকদের ধরে রাখতে বিটিসিএল চেষ্টা করলেও শুধুমাত্র ভয়েস কলের সুযোগ দিয়ে গ্রাহক ধরে রাখা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

টেলিকম ও আইটি খাতের বিশ্লেষক টি আই এম নূরুল কবির বলছেন, ‘আমার মনে হয়, শুধু ভয়েসের প্রস্তাব দিয়ে জনগণকে কতটা আকৃষ্ট করা যাবে, এ নিয়ে সন্দেহ আছে। মোবাইল ফোনের বিকল্প হিসাবে শুধু সস্তায় কথা বলার জন্য একটি ফিক্সড ফোনের প্রয়োজনীয়তা মানুষ অনুভব করতে নাও পারে।”

তিনি বলছেন, বর্তমান বিশ্বে উন্নত দেশগুলোয় ফিক্সড ফোনের সঙ্গে মানুষ ইন্টারনেট, টিভি, স্ট্রিমিং ইত্যাদি সুবিধা দেয়া হয়, যা প্রচলিত মোবাইলের চেয়ে কম খরচে পাওয়া যায়। ফলে সেখানে এখনো এ ধরণের ফোনের চাহিদা আছে।

নূরুল কবির বলছেন, সেসব সেবা যদি যুক্ত করা হয়, যা বিটিসিএলের সক্ষমতার ভেতরেই আছে, তাহলে অবশ্যই এটা গ্রাহকের কাছে একটি প্রয়োজনীয় সংযোগ মনে হতে পারে।

ফাইবার অপটিক সংযোগের মাধ্যমে ঘরে ঘরে ইন্টারনেট পৌঁছে দেয়ার একটি প্রকল্প বিটিসিএলের আছে। এই ল্যান্ড ফোন সংযোগে যদি সেটা যোগ করা যায়, এবং খরচ কম হয়,তাহলে অনেক গ্রাহক নতুন করে আকৃষ্ট হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

”শুধুমাত্র মাসিক লাইন রেন্ট বাতিল করে দিলে বা বিটিসিএলে ইচ্ছামতো কথা বলার সুযোগ দিলে গ্রাহক বাড়বে বা গ্রাহকরা নতুন করে নেবে, আমার সেটা মনে হয়না,” বলছেন টি আই এম নূরুল কবির।

বিটিসিএলের কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি তারাও উপলব্ধি করেছেন এবং গ্রাহকদের ফেরাতে কিছু প্রকল্পও নেয়া হয়েছে।

বিটিসিএলের এমডি ইকবাল মাহমুদ বলছেন, ”এখনো ল্যান্ডলাইনে ইন্টারনেট সুবিধা দেয়ার একটি প্রকল্প আমাদের আছে। পাশাপাশি আমরা নতুন কিছু প্রকল্প নিয়েছে, যার মাধ্যমে সবগুলো এক্সচেঞ্জ ডিজিটাল করে ফেলা হচ্ছে। তখন গ্রাহকরা ঘরে বসে উন্নত দেশগুলোর মতো ল্যান্ডলাইন দিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের পাশাপাশি স্ট্রিমিং ও অন্যান্য সেবাও পাবেন।”

তার মতে, মোবাইলের অভ্যস্ততা থেকে চট করে ব্যবহারকারী হয়তো ল্যান্ডলাইনে আগ্রহী হবে না, কিন্তু নানা সুবিধা দেখতে পেলে আস্তে আস্তে তাদের সংখ্যা বাড়বে।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু সুবিধার ঘোষণাই নয়, সেটা বাজারে প্রচলিত অন্যান্য সেবার চেয়ে কম মূল্যে হলে হয়তো গ্রাহকরা আকৃষ্ট হতে পারে। সেই সঙ্গে গ্রাহক সেবার মানটিও নিশ্চিত করতে হবে।



জুমবাংলানিউজ/এসবি




আপনি আরও যা পড়তে পারেন